বন্যায় ঘরছাড়া মানুষ খাবার আর আশ্রয় খুঁজতেই দিশাহারা ঈদ কাটবে নিরানন্দে

প্রেরণা ডেস্কঃ
দুই চোখ যেদিকে যায় শুধু পানি আর পানি। বানে তলিয়েছে বাড়িঘর। উঠানেও আশ্রয়ের জো নেই। জীবন বাঁচাতে সড়ক কিংবা বাঁধই এখন শেষ আশ্রয়স্থল; গত রবিবার থেকে সেখানেও বৃষ্টির হানা।
ভারি বর্ষণের সঙ্গে এলোমেলো বাতাস দুর্ভোগ আরো বাড়িয়েছে বানভাসিদের। বাতাসের তোড়ে বৃষ্টির পানি ঘরে ঢুকে ভিজিয়ে দিচ্ছে আসবাব। রবিবার থেকে টানা দুই দিন ভারি বর্ষণে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের মানুষের অবস্থা এখন এমনটাই দুর্বিষহ। বানের পানিতে বাড়িঘর ছাড়া এসব মানুষ খাবার জোগাড় আর আশ্রয় খুঁজতেই নাজেহাল। কোরবানির ঈদ ঘিরে যারা পশু লালন-পালন করেছিল, বন্যার কারণে তারাও পড়েছে সংকটে। অনেকে পানির দামে বিক্রি করে দিচ্ছে পশু। শুধু গাইবান্ধা নয়, দীর্ঘমেয়াদি বন্যার কারণে দুঃসহ জীবন পার করছে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-মধ্যাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের কমপক্ষে ২৫ জেলার মানুষ। এদিকে প্রথম পর্যায়ের বন্যায় প্রায় ৩৪৯ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক।
প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের কারণে এমনিতেই পাঁচ মাস ধরে অস্থিরতায় কাটছে দিন। প্রতিদিনই করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রাণহানি ঘটছে। গত জুনে করোনার মধ্যেই ঘূর্ণিঝড় আম্ফান এসে লণ্ডভণ্ড করে দেয় দক্ষিণাঞ্চল। সেই ক্ষতির রেশ না কাটতেই দেশের ২৫ জেলায় চলছে দীর্ঘমেয়াদি বন্যা। প্রথম দফায় ৩০ জুন, ১১ জুলাই দ্বিতীয় দফা বন্যার পর তৃতীয় দফায় ফের দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ধেয়ে আসছে বন্যা। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হওয়ায় বিভিন্ন জেলায় ভারি বর্ষণও শুরু হয়েছে। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে বৃষ্টি। অন্যদিকে ভারতের আসাম, মেঘালয়সহ অন্যান্য রাজ্যেও ভারি বর্ষণ চলছে। ফলে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও দেশের ভেতরে ভারি বর্ষণের কারণে আজ মঙ্গলবার থেকে দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নদ-নদীর পানি সমতল থেকে দ্রুত বাড়তে থাকবে। এতে বন্যা পরিস্থিতির ফের অবনতি হতে পারে। এমনই আভাস দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। সংস্থাটি বলেছে, এই মাসের বাকি দিনগুলোও বন্যাকবলিত থাকবে দেশের কমপক্ষে ২৫ জেলা। ফলে ওই সব জেলায় আসন্ন ঈদুল আজহা কাটবে নিরানন্দে।
আবহাওয়া অফিস থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, বাংলাদেশের ওপর মৌসুমি বায়ু বেশ সক্রিয়। ফলে দেশের প্রায় সব জেলায়ই রবিবার রাত থেকে মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণ হচ্ছে। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতেও টানা বৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে রাজধানীতে গতকাল সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় ৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। আগের রাতে ঢাকায় বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে ১৯ মিলিমিটার। আবহাওয়াবিদ আব্দুল মান্নান বলেন, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের বেশির ভাগ জেলায়ই দমকা হাওয়াসহ মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকবে। অন্য বিভাগগুলোতেও আজ ও হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হবে।
এদিকে কুড়িগ্রামে রবিবার রাত থেকে টানা বৃষ্টির কারণে ধরলার পানি বেড়ে ফের পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ধরলাপারের মানুষ। অন্যদিকে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি অপরিবর্তিত থাকলেও বিপৎসীমার ওপরে অবস্থান করায় টানা তিন সপ্তাহ মানুষ অবর্ণনীয় কষ্টে রয়েছে। তিস্তার ভাঙনে রাজারহাটের ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের বুড়িরহাট স্পারটি যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে যেতে পারে। এদিকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। ফলে তৃতীয় দফায় সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনায় বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এসব জেলায় বন্যা পরিস্থিতির ফের অবনতি হতে পারে। সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জ পয়েন্টে সোমবার বিকেলে বিপৎসীমার ৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নতুন করে পানি বেড়ে সুনামগঞ্জ শহরের সাহেববাড়ি পয়েন্ট ও নবীনগর এলাকা আবারও প্লাবিত হয়েছে।
টানা দুই দফা বন্যা আর ভাঙনে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের চরাঞ্চলসহ অববাহিকার হাজারো মানুষ দিশাহারা হয়ে পড়েছে। বন্যার পানির স্রোতে অনেকের বাড়িঘর ভেসে যাওয়ায় সর্বস্বান্ত সহস্রাধিক পরিবার। বন্যার পানির স্রোতে নদীর গতিপথ বদলে গিয়ে ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে বাড়িঘর। গতকাল দুপুরে তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ৪৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে আট ইউনিয়নের অন্তত ১১ হাজার পরিবারের ৪৬ হাজার মানুষ।
গত ১২ ঘণ্টায় ফরিদপুরে পদ্মা নদীর পানি বেড়ে বিপৎসীমার ১০৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ফলে জেলা সদরের সঙ্গে চরভদ্রাসন ও সদরপুরের যোগাযোগের সড়কটি বন্ধ হয়ে গেছে। ওই সড়কের কয়েকটি স্থান পানিতে ডুবে আছে। এ ছাড়া ওই সড়কের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দেওয়ায় হুমকির মুখে রয়েছে। গতকাল সকালে ফরিদপুর শহরের বর্ধিত পৌরসভার ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে একটি পাকা সড়ক পানির চাপে ভেঙে গেছে। ফরিদপুরের ৩০টি ইউনিয়নের মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। ভাঙন দেখা দিয়েছে মধুমতী নদীর আলফাডাঙ্গা ও মধুখালীর কয়েকটি ইউনিয়নে।
যমুনা নদীর প্রবল ঘূর্ণাবর্তে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরের বেতিল সলিড স্পারে ধস নেমেছে। আকস্মিক এই ধসে স্পারের প্রায় ৭৫ মিটার এলাকা ধসে যাওয়ায় এলাকাজুড়ে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড ধসের বিস্তৃতি ঠেকাতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা শুরু করেছে।
কুড়িগ্রাম পৌর এলাকার ৩০ হাজার মানুষ বন্যা ও জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। এসব এলাকার ঘরবাড়ি ডুবে আছে। রাস্তায় চলছে কলাগাছের ভেলা আর নৌকা। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের স্লুইস গেট দিয়ে সপ্তাহখানেক আগে পানি ঢুকেছিল। এতে ঘরবাড়ি ও সড়কে পানি ওঠে। গত দুই দিনের ভারি বর্ষণের কারণে পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন

Leave a Comment