পুলিশের গুলিতে মারা যাওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা নিহতের ঘটনায় যৌথ তদন্ত দল চায় সেনাসদর

প্রেরনা ডেস্কঃ

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কে পুলিশের গুলিতে সেনাবাহিনীর একজন অবসর প্রাপ্ত মেজর নিহত হওয়ার ঘটনায় যৌথ তদন্ত দল চায় সেনাসদর । বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) রাত সাড়ে ১০টার দিকে সড়কের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে ঘটে এ ঘটনা। নিহত সেনা কর্মকর্তার নাম সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান (৩৬)। আই
জানা গেছে, নিহত সেনা কর্মকর্তা সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান যশোরের ১৩ বীর হেমায়েত সড়কের সেনানিবাস এলাকার মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন উপসচিব মো. এরশাদ খানের ছেলে।
এদিকে ঘটনাটি তদন্তের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শাজাহান আলীকে প্রধান করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও রামু ১০ পদাতিক ডিভিশনের জিওসির একজন প্রতিনিধি সহকারে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে
এদিকে মেরিন ড্রাইভ সড়কে একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা নিহতের ঘটনা নিয়ে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য রয়েছে। এমনকি পুলিশ যদিওবা দাবি করেছে, দুর্ধর্ষ রোহিঙ্গা ডাকাত বাহিনীর সদস্য পাহাড় থেকে নেমে আসার খবর পেয়েই বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বরত পরিদর্শক লিয়াকতের নেতৃত্বে একদল পুলিশ মেরিন ড্রাইভে অবস্থান নিয়েছিল।
লোকজনের দেওয়া খবর অনুযায়ী টেকনাফ থেকে কক্সবাজারমুখি একটি প্রাইভেটকারের আরোহীর সঙ্গে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে বাহারছড়া ফাঁড়ির দায়িত্বরত পুলিশ ইন্সপেক্টর লিয়াকত গুলি চালায়। পুলিশের দাবি ওই সেনা কর্মকর্তা নিজের পিস্তল বের করেছিলেন পুলিশের প্রতি। ঘটনার পর পরই কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা গুলিবিদ্ধ আরোহী মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদকে মৃত ঘোষণা করেন।
অপরদিকে চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর শনিবার বিকালে মেরিন ড্রাইভ রোডের বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ি এলাকার ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনীর একটি তদন্ত দল ঘটনা তদন্তে যায়। এসময় এলাকার লোকজন সেনাবাহিনীর তদন্ত দলটিকে দেখে এগিয়ে আসেন। লোকজনের নিকট তদন্ত দলের কর্মকর্তারা শুক্রবার রাতের ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের ব্কতব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র ফুটে উঠে।
কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার শামলাপুর তল্লাশি চৌকিতে পুলিশের গুলিতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান নিহত হওয়ার ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অনভিপ্রেত বলে জানিয়েছে সেনাসদর।
এ ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত জানিয়ে সেনাসদর বলছে: মেজর (অব.) সিনহা গাড়ি থামিয়ে তাদের পরিচয় দিলে প্রথমে তাদের যাওয়ার জন্য সংকেত দিলেও এসআই লিয়াকত তাদের পুনরায় থামায় এবং তাদের দিকে পিস্তল লক্ষ্য করে গাড়ি থেকে নামতে বলে। মেজর সিনহা হাত উঁচু করে গাড়ি থেকে নামার পরপরই এসআই লিয়াকত তাকে লক্ষ্য করে তিন রাউন্ড গুলি করে। জানা যায় যে, এসআই লিয়াকত কোনরূপ কথাবার্তা না বলেই গাড়ি থেকে নামার পরপরই মেজর সিনহাকে করে লক্ষ্য গুলি করে।
এক বিজ্ঞপ্তিতে সেনাসদর জানায়: বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ পুলিশ দু’টি সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে দেশমাতৃকার সেবায় কাজ করে আসছে। পেশাদার এ দুটি বাহিনীর মধ্যকার পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও কর্মপরিবশে অত্যন্ত চমৎকার। কক্সবাজার পুলিশ দ্বারা বর্ণিত অপ্রীতিকর ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছে যা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অনভিপ্রেত।
ঘটনার বিবরণী বিশ্লেষণ করে সেনাসদর বলছে: ‘‘প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী স্যুটিংয়ের জন্য মেজর (অব.) সিনহা সামরিক পোশাক পরিধান করেছেন, যা পরিধান করার আগে স্থানীয় সেনা কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা উচিত ছিল।
একজন সামরিক পোশাকধারী কর্মকর্তা পরিচয় প্রদানের পরও কোনো জিজ্ঞাসাবাদ ব্যতিত এসআই লিয়াকত কর্তৃক গুলিবর্ষণ করার ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একইসাথে একজন ব্যক্তি হাত তুলে গাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তাকে আটক না করে সরাসরি গুলি করা সম্পূর্ণ আইন বহির্ভুত।
পুলিশ কর্তৃক এএসইউ এর মাঠকর্মী পরিচয় জানার পরেও তার পরিচয় ও মোবাইল ছিনিয়ে নেয়াটা সমীচিন হয়নি।’’
সেনাসদর জানায়: ‘‘সামরিক পোশাক পরিহিত থাকা অবস্থায় মেজর (অব.) গুলি করার পরই তার বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্ট অভিযোগ উত্থাপনের ঘটনাটিকে অন্য খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা বলে অনুমেয়।
ঘটনাটির যথাযথ তদন্তের প্রয়োজনে উভয় বাহিনীর কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি যৌথ তদন্ত দল গঠন করাসহ তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে দোষী ব্যক্তিদের যথাযথ আইনের আওতায় আনা যেতে পারে।
করোনা মহামারির এই কঠিন সময়ে সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ পুলিশ সম্মুখ সারিতে থেকে দেশের জন্য প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। তাই ভবিষ্যতে দুই বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে যে কোন ধরণের ভুল বুঝাবুঝি এড়ানোর লক্ষ্যে যৌথ তদন্ত কার্যক্রম অনতিবিলম্বে শুরু করা এবং তা সংশ্লিষ্ট সকলকে অবহতি করা উচিৎ।’’
শুক্রবার রাত ৯টার দিকে টেকনাফের বাহারছড়ায় কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর তল্লাশি চৌকিতে পুলিশের গুলিতে সিনহা রাশেদ খান নিহত হন।
এ ব্যাপারে জেলা পু‌লিশ জা‌নি‌য়ে‌ছে: সাবেক ওই সেনা কর্মকর্তা তার ব্যক্তিগত গা‌ড়ি‌তে ক‌রে অপর একজন স‌ঙ্গীসহ টেকনাফ থে‌কে কক্সবাজার আস‌ছি‌লেন। মে‌রিন ড্রাইভ সড়‌কের বাহারছড়া চেক‌পো‌স্টে পু‌লিশ গা‌ড়ি‌টি থা‌মি‌য়ে তল্লাশি কর‌তে চাইলে সেনা কর্মকর্তা বাধা দেন। এই নি‌য়ে তর্ক-বিত‌র্কের একপর্যা‌য়ে সেনা কর্মকর্তা তার কা‌ছে থাকা পিস্তল বের কর‌লে পুলিশ গু‌লি চালায়। এতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান গুরুতর আহত হন। তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতা‌লে নি‌য়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা ক‌রেন। আজ শ‌নিবার সকা‌লে নিহ‌তের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হ‌য়ে‌ছে।
কক্সবাজা‌রের পু‌লিশ সুপার এবিএম মাসুদ হো‌সেন জা‌নি‌য়ে‌ছেন: শামলাপু‌রের লোকজন ওই গা‌ড়ির আরোহীদের ডাকাত স‌ন্দেহ ক‌রে পু‌লিশকে খবর দেয়। এই সম‌য়ে পু‌লিশ চেক‌পো‌স্টে গা‌ড়ি‌টি থামা‌নোর চেষ্টা ক‌রে। কিন্তু গা‌ড়ির আরোহী একজন তার পিস্তল বের ক‌রে পু‌লিশ‌কে গু‌লি করার চেষ্টা ক‌রে। আত্মরক্ষা‌র্থে পু‌লিশ গু‌লি চালায়। এতে ওই ব্য‌ক্তি মারা যান।
মেজর অবসরপ্রাপ্ত সিনহা রাশেদ খান ২০১৮ সালে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন। তিনি রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ থেকে ২০০২ সালে এইচএসসি পাস করেন। তিনি গত ৩ জুলাই ঢাকা থেকে স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের তিনজন ছাত্রছাত্রীসহ একটি ইউটিউব চ্যানেলের জন্য একটি ট্রাভেল ভিডিও তৈরি করতে কক্সবাজার আসেন। প্রায় এক মাস যাবত তারা কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে শুটিং করেন।
অন্যদিকে মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন তার রাজউক কলেজের বন্ধুরা। তারা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন

Leave a Comment