গ্রেপ্তার ‘গোল্ডেন মনির’


প্রেরণা ডেস্কঃ
র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে প্রভাবশালী মন্ত্রী, গণপূর্ত ও রাজউক কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে ভূমি জালিয়াতি শুরু করেন মনির। রাজউকের সরকারি প্লটের নথিপত্র চুরি ও জালিয়াতি করে পূর্বাচল, বাড্ডা, নিকুঞ্জ, উত্তরা ও কেরানীগঞ্জের ৩০টি স্থানে অন্তত ২০০টি প্লট দখলে নিয়েছেন তিনি।
একটি গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি ও তদন্তে সন্দেহ হওয়ায় চিকিৎসার নামে গতকালই দুবাইতে পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন মনির।
শুক্রবার রাত ১১টা থেকে মনিরের মেরুল বাড্ডার ডিআইটি প্রজেক্ট এলাকার ১৩ নম্বর রোডের ৪১ নম্বর বাড়িতে অভিযান শুরু করে র‌্যাব-৩।
গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে অভিযান শেষে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, অভিযানের মূল কারণ ছিল অবৈধ অস্ত্র ও মাদক। মনিরকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর হেফাজত থেকে চার রাউন্ড গুলিসহ একটি বিদেশি পিস্তল, চার লিটার বিদেশি মদ, ৬০০ ভরি সোনা (আট কেজি) জব্দ করা হয়েছে। জব্দ করা বিদেশি মুদ্রার মধ্যে আছে ২০ হাজার ৫০০ সৌদি রিয়াল, ৫০১ ইউএস ডলার, ৫০০ চায়নিজ ইয়েন, ৫২০ রুপি, এক হাজার সিঙ্গাপুরের ডলার, দুই লাখ ৮০ হাজার জাপানি ইয়েন, ৯২ মালয়েশিয়ান রিংগিত, হংকংয়ের ১০ ডলার, ১০ ইউএই দিরহাম, ৬৬০ থাই বাথ। এগুলোর মূল্যমান আট লাখ ২৭ হাজার ৭৬৬ টাকা। এ ছাড়া এক কোটি ৯ লাখ টাকা, অনুমোদনহীন দুটি বিলাসবহুল গাড়ি, রাজউক ও ভূমি কর্মকর্তাদের ৩২টি নকল সিল, জাল দলিলসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়। অটো কার সিলেকশন নামে তাঁর মালিকানাধীন গাড়ির শোরুম থেকেও তিনটি অনুমোদনহীন গাড়ি জব্দ করা হয়েছে।
মনির সম্পর্কে এই র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, তিনি মূলত একজন হুন্ডি ব্যবসায়ী, সোনা চোরাকারবারি ও ভূমির দালাল। অটো কার সিলেকশন নামে তাঁর একটি গাড়ির শোরুম আছে। পাশাপাশি রাজধানীর গাউছিয়ায় একটি সোনার দোকানের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা তাঁর বাসা থেকে অনুমোদনবিহীন বিলাসবহুল দুটি বিদেশি গাড়ি জব্দ করেছি, যার প্রতিটির দাম প্রায় তিন কোটি টাকা। এর পাশাপাশি কার সিলেকশন শোরুম থেকেও আমরা তিনটি বিলাসবহুল অনুমোদনবিহীন গাড়ি জব্দ করেছি।’
লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ আরো বলেন, ‘বিপুল পরিমাণ সোনা অবৈধ পথে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছেন গোল্ডেন মনির। আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে, তাঁর সোনা চোরাকারবারের রুট ছিল ঢাকা-সিঙ্গাপুর-ভারত। এসবই তিনি করেছেন ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে, যার ফলে তাঁর নাম হয়ে যায় গোল্ডেন মনির। তাঁর আরেকটি পরিচয় হচ্ছে তিনি ভূমিদস্যু। রাজউকের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি।’
র‌্যাব কর্মকর্তা জানান, ঢাকা শহরের ডিআইটি প্রজেক্টের পাশাপাশি বাড্ডা, নিকুঞ্জ, পূর্বাচল, উত্তরা ও কেরানীগঞ্জ এলাকায় মনিরের দুই শতাধিক প্লট আছে। এরই মধ্যে তিনি তাঁর ৩০টি প্লটের কথা র‌্যাবের কাছে স্বীকার করেছেন।
র‌্যাবের এই পরিচালক বলেন, রাজউকের কাগজপত্র জাল-জালিয়াতি করে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদ করেছেন এবং স্বর্ণ চোরাচালানের মাধ্যমে তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় এক হাজার ৫০ কোটি টাকা। তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), মানি লন্ডারিংয়ের জন্য অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং ট্যাক্স ফাঁকি এবং এসংক্রান্ত বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানাবেন তাঁরা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, গতকাল বাড্ডা থানায় মনিরের বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে তিনটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছিল।
র‌্যাব ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সোনা চোরাকারবারে জড়ানোয় ২০০৭ সালে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মনিরের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ২০১৯ সালে ৭০টি প্লটের নথি চুরি করে নিজ কার্যালয়ে নেওয়ার অভিযোগে রাজউক তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করে।

আরও পড়ুন

Leave a Comment