শেষ ঠিকানায় ম্যারাডোনা


প্রেরণা ডেস্কঃ
দুই পাশ থেকে দুজন ধরে আছেন, ম্যারাডোনা একটু একটু করে পা ফেলছেন, ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল তাঁর, বোঝাই যাচ্ছিল। পেছনে ভাঁজ করা চেয়ার হাতে একজন, ক্লান্ত হয়ে পড়লেই যেন বসতে পারেন। মৃত্যুর আগের দিন সান আন্দ্রেসের বাড়ির আঙিনায় ম্যারাডোনার সেটিই শেষ সচল ছবি। ভিডিওটা শেষ হয়েছে চমকে দিয়ে। পাশের বাড়ি থেকেই হয়তোবা ছোট্ট একটি মেয়ে তাঁকে ডাকছিল ‘হোলা (হ্যালো) ডিয়েগো, হোলা ডিয়েগো’ বলে। মস্তিষ্কে অপারেশন করিয়ে দিন কয়েক আগেই বাড়ি ফেরা ডিয়েগো সেই ডাক উপেক্ষা করতে পারেননি, কষ্ট সয়েই ঘাড় ফিরিয়েছেন, হাত তুলে জবাবও দিয়েছেন ছোট্ট দেবদূতকে।


কাল আর্জেন্টিনার রাস্তায় মাতম করতে থাকা এক ভক্ত বলছিলেন, তাঁর প্রিয় ডিয়েগোও এখন দেবদূতদের মাঝে। হয়তো সেখানে অধিনায়কের আর্মব্যান্ডও দেওয়া হয়েছে তাঁকে। মর্তে হলো শুধু তাঁর বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা। প্রেসিডেন্ট প্যালেস থেকে তাঁর কফিন বহন করা গাড়ি বুয়েনস এইরেসের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে জার্দিন বেলা ভিস্তা সমাধিক্ষেত্রের দিকে যখন ছুটছে, তখন হাইওয়েজুড়ে সেই শোকে উন্মাদ হওয়া ভক্ত-সমর্থকদের ঢল। বেলা গড়িয়ে ৬টা বাজতেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের শেষ দেখার আয়োজন। তখনো কিলোমিটারখানেক ভক্তদের লাইন, অসহিষ্ণু। একদল প্রাসাদের গেট টপকে ভবনেই ঢুকে পড়তে গেলে টিয়ারগ্যাস ছোড়া হয়। দ্রুত ম্যারাডোনার কফিনও সরিয়ে ফেলা হয় অন্য ঘরে। এরপর আর দেরি করেননি স্বজনরা, তাঁকে সমাহিত করার আয়োজন শুরু হয়। কফিন গাড়িতে তোলার সময় আরেক দফা উন্মত্ততা। নিরাপত্তারক্ষীদের বাধা মানতে চাইছিলেন না কেউ। ঠিক যেন আশির দশকের পাগুলে কোনো ফুটবল ম্যাচ শেষে প্রিয় তারকাকে ছুঁয়ে দেখার আকুলতা। নিরাপত্তারক্ষীদের শত শত মোটরসাইকেল আর স্বজনদের গাড়ির বহর ঘিরে থাকা সমর্থকরা বিশ্বকাপ জিতে ফেরা কোনো দলের প্যারেডের স্মৃতিও যেন ফিরিয়ে এনেছিলেন। কল্পনায় তাঁরা হয়তো কাপ হাতে ম্যারাডোনাকেই দেখছিলেন আবার। বিশ্বকাপ ট্রফির একটি রেপ্লিকা কাল প্রেসিডেন্ট প্যালেসে ম্যারাডোনার কফিনের পাশেও ছিল।
ম্যারাডোনা এবং ওই ট্রফি—কে কাকে মিস করবে এ নিয়ে তর্ক হতে পারে। তবে ওই যুগল ছবি ভক্তদের মানসপটে থেকে যাবে চিরদিন। প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ও রাস্তার ওই হল্লা ছাড়িয়ে ম্যারাডোনা সমাহিত হয়েছেন যেখানে, সেই জার্দিন বেলা ভিস্তা সমাধিক্ষেত্র প্রকৃতির কোল যেন। গাছপালা ঘেরা, সবুজ ঘাসের জমিনে শেষ ঘুমে ফুটবল ঈশ্বর। দুটি সত্তা তাঁর, একটা বাঁধনহারা, জোয়ারের জলের মতো আছড়ে পড়েন সবখানে, করেন যা ইচ্ছা তাই। ম্যারাডোনাকে ঘিরে তাঁর ভক্তদের পাগলামো সেই সত্তাকেই মনে করায়। আবার ওই নিবিড় সবুজ, নীরবতা—মনে করায় শিল্পীর তুলির মতো বল পায়ে তাঁর মাঠে আঁচর কেটে যাওয়া। নীরবতা রাখতে শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে বাড়তি কোনো মানুষজনই ছিলেন না। স্বজন এবং খুব ঘনিষ্ঠজন মিলিয়ে ২৪ জন আর আনুষ্ঠানিকতার জন্য আরো জনা দশেক। ম্যারাডোনার প্রথম জীবনের প্রেম, ২০ বছরের সঙ্গিনী ক্লদিয়া ভিলাফেন সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর দুই কন্যা দালমা ও জিয়ানিনাকে। পারিবারিক ছবিতে ম্যারাডোনাকে তাঁদের সঙ্গেই দেখা গেছে বেশি। ক্লদিয়ার সঙ্গে পরে বিচ্ছেদ হয়ে যায়, তবে মেয়েরা তাঁর পাশেই ছিলেন সব সময়। আরো এক মেয়ে এবং দুই ছেলেকে স্বীকৃতি দিয়েছেন ম্যারাডোনা। তাদের মধ্যে ডিয়েগো জুনিয়রের জন্ম নেপলসে।
আর্জেন্টিনার মতো ইতালির দক্ষিণের ওই শহরও ম্যারাডোনার শোকে মাতম করেছে। বুয়েনস এইরেসে তাঁর শেষবিদায়ের সময়ে ইউরোপা লিগে তাঁর ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নেমেছেন নাপোলির খেলোয়াড়রা। প্রায় অখ্যাত নাপোলিকে ইতালির চ্যাম্পিয়ন বানিয়েছিলেন দুইবার, এই ইউরোপা লিগ তখনকার উয়েফা কাপ জিতিয়েছিলেন প্রথমবারের মতো, শেষবারও সেটা। নেপলস তাই কখনো ভুলতে পারে না তাঁকে। ২০১৬ সাল পর্যন্ত নাপোলির সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে ছিলেন, মারেক হামসিক প্রথম ছাড়ান তাঁকে, পরে দ্রিস মের্তেন্স। সেই মের্তেন্স কিংবদন্তির মৃত্যুর পর শোক জানিয়ে বলছিলেন, ‘কখনো যদি তোমার পাশে নাম উচ্চারিত হয় আমার, তবে ক্ষমা কোরো। তোমার পর্যায়ে কখনোই যাওয়া সম্ভব নয় আমার জন্য।’ ম্যারাডোনা বাঁ পায়ে ফুটবলের ঐশ্বর্য বিলিয়েছেন, তেমনি পেয়েছেন এমনই শ্রদ্ধার্ঘ। কাল কোপা লিবার্তাদোরেসের ম্যাচে ব্রাজিলিয়ান ক্লাব গ্র্যামিওর কোচ রেনাতো গাউচো মাঠে পরে এসেছেন ম্যারাডোনার নাম লেখা আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সিটা। কালও পৃথিবীর যে প্রান্তেই ম্যাচ হয়েছে সবাই মুুহূর্তের জন্য নীরব হয়েছেন এই কিংবদন্তিকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। কাতারে এএফসি চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচের আগে সেই নীরবতা পালন হয়েছে। চীনে আর্জেন্টিনার দূতাবাসের সামনে ম্যারাডোনার ছবি, ফুল রেখে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন চীনারা। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট আলবার্তো
ফের্নান্দেস যেমন বলেছেন, ‘তিনি আকাশ ছুঁয়েছিলেন পা মাটিতে রেখেই।’ ম্যারাডোনার শেষ যাত্রায় উন্মাদনা, আবেগ, শোক ছুঁয়েছে তাই সবখানেই।

আরও পড়ুন

Leave a Comment